অনিশ্চয়তার মধ্যেই কার্যকর হলো ট্রাম্পের শুল্কহার

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান এখন কমতির দিকে। মন্দার আশঙ্কায় আবাসন খাত।

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান এখন কমতির দিকে। মন্দার আশঙ্কায় আবাসন খাত। নির্মাণ খাতের ব্যয়ও এখন পড়তির দিকে। উৎপাদনশীলতা কমছে। যদিও উৎপাদনে ব্যয় বেড়ে কমে যাচ্ছে কর্মীর প্রকৃত মজুরি। বাড়ছে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা। এর মধ্যেই বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত শুল্কহার কার্যকর হয়েছে গতকাল। সে অনুযায়ী ৬০টির বেশি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক পরিশোধ করতে হবে ১০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে কোনো কোনো দেশের ক্ষেত্রে এ হার অদূর ভবিষ্যতে আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খবর রয়টার্স, বিবিসি ও এপি।

যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন (সিবিপি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট অর্থাৎ গতকাল থেকে নতুন শুল্ক আদায় শুরু হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগে যুক্তরাষ্ট্রগামী জাহাজে থাকা পণ্য আগামী ৫ অক্টোবর পর্যন্ত পুরনো শুল্কহারেই প্রবেশ করতে পারবে।

ট্রাম্প কিছু দেশের ওপর শুল্কহার আরোপ করেছেন অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি। আবার কোনো কোনো দেশের ওপর পূর্বে আরোপিত শুল্কের সঙ্গে নতুন করে আরো শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। যেমন শুরুতে ব্রাজিলের পণ্যে ৫০ শতাংশ, সুইজারল্যান্ডে ৩৯ শতাংশ, কানাডায় ৩৫ শতাংশ ও ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন তিনি। পরে গত বুধবার ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে নতুন করে আরো ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প, যা ২১ দিনের মধ্যে কার্যকর হবে। ভারতের ওপর এ অতিরিক্ত শুল্কহার আরোপের পেছনে রাশিয়া থেকে দেশটির জ্বালানি পণ্য আমদানিকে দায়ী করেছেন ট্রাম্প।

ভারতের রফতানিকারক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের কারণে দেশটির প্রায় ৫৫ শতাংশ রফতানি পণ্য মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। বিশেষ করে যেসব পণ্যে লাভের পরিমাণ খুব কম (অর্থাৎ উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান খুব কম), সেসব খাতে আকস্মিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় রফতানিকারকরা দীর্ঘদিনের ক্রেতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মন্দা ভাব বিরাজ করছে এপ্রিল থেকে। নতুন শুল্ক ঘোষণার জেরে নিয়োগ কমেছে, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ আর গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোয় আবাসনমূল্য কমতে শুরু করেছে। নির্মাণ খাতে ব্যয় কমেছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ট্রাম্প যেসব শিল্পে চাকরি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেখানে বরং কর্মসংস্থান কমেছে।

ডায়নামিক ইকোনমিক স্ট্র্যাটেজির প্রধান নির্বাহী জন সিলভিয়া বলেন, ‘শুল্কমূল্য বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ধীরে ধীরে কম উৎপাদনশীল হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক কোম্পানির আর আগের মতো কর্মী প্রয়োজন হচ্ছে না। সেই সঙ্গে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কর্মীদের প্রকৃত মজুরি কমে যাচ্ছে।’

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ ব্র্যাড জেনসেন বলেন, ‘এটা কোনো নাটকীয় বা হঠাৎ ধাক্কার মতো নয়, বরং ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’

সেঞ্চুরি ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো র‍্যাচেল ওয়েস্ট বলেন, ‘অনিশ্চয়তা ট্রাম্প তৈরি করছেন, তা মোকাবেলায় তিনি হয়তো প্রস্তুত। কিন্তু সাধারণ মার্কিনরা এরই মধ্যে এর মূল্য দিচ্ছেন।’

শুল্কহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আটটি বড় বাণিজ্যিক অংশীদার দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট বাণিজ্যে দেশগুলোর হিস্যা প্রায় ৪০ শতাংশ। এতে এসব দেশের পণ্যের ওপর শুল্কহার কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য নতুন শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ শতাংশ। ব্রিটেনের ক্ষেত্রে এ হার ১০ শতাংশ। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের জন্য শুল্কহার কমিয়ে ১৯-২০ শতাংশে আনা হয়েছে।

তবে যেসব দেশ চুক্তিতে পৌঁছতে পারেনি, তাদের ওপর তুলনামূলক বেশি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যেমন লাওস ও মিয়ানমারের মতো উৎপাদনমুখী অর্থনীতির দেশগুলোকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিবিসি বলছে, এসব দেশের চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে ট্রাম্প এ হারে শুল্ক আরোপ করছেন বলে অনেকেই ধারণা করছেন।

কানাডার শুল্কহার বাড়িয়ে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, কানাডা মাদক পাচার ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে কানাডা বলছে, তারা এরই মধ্যে মাদকচক্র দমনে কড়াকড়ি ব্যবস্থা নিয়েছে এবং বিদ্যমান যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তির (ইউএসএমসিএ) আওতায় বেশির ভাগ পণ্য মার্কিন শুল্ক থেকে মুক্ত থাকবে।

চিপ উৎপাদন শিল্পে বিদেশনির্ভরতা কমাতে ট্রাম্প অন্যান্য দেশে তৈরি সেমিকন্ডাক্টরের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশ দুটির বড় চিপ প্রস্তুতকারক টিএসএমসি, স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স নতুন শুল্ক থেকে ছাড় পেয়েছে।

ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি ঘিরে উদ্বেগ থাকলেও এশিয়ার শেয়ারবাজারে গতকাল তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। বরং জাপান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের শেয়ারবাজার সূচক কিছুটা বেড়েছে। তবে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সূচক ছিল নিচের দিকে।

ট্রাম্প এরই মধ্যে মাইক্রোচিপ, ফার্মাসিউটিক্যালস, অটোমোবাইল, ইস্পাত, তামা, কাঠসহ বিভিন্ন খাতে জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আলাদা শুল্ক আরোপ করেছেন। এখন নতুনভাবে এসব পণ্যে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কার্যকরের প্রস্তুতি নিচ্ছে হোয়াইট হাউজ।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে শত শত বিলিয়ন ডলার আসতে শুরু করেছে। তবে তিনি শুল্ক থেকে রাজস্বের নির্দিষ্ট অংক জানাননি। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্যমতে, বছরে শুল্ক থেকে রাজস্ব ৩০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

মার্কিন শুল্কনীতি কার্যকরে যে আইনি ভিত্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ১৯৭৭ সালের এক আইনের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। বিষয়টি এখন আদালতের বিচারাধীন।

আরও